
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি এবং লোহিত সাগরে হুথিদের জাহাজে হামলার পর ইয়েমেনে ইসরায়েলি হামলার মধ্যে সপ্তাহের শুরুটা নেতিবাচক ছিল। এতে দুই সপ্তাহ ধরে দরপতনের পর মার্কিন ডলার ঘুরে দাঁড়ায়। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনৈতিক তথ্য এবং Fed চেয়ার পাওয়েলের মন্তব্যও Fed-এর নীতিতে নমনীয়তার প্রত্যাশা কমিয়েছে। তবে সুদের হার কমানোর জন্য ট্রাম্পের চাপ, পাওয়েলের উত্তরসূরি নিয়োগের বিষয়টি, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে আসা—এসব কারণে ডলার ইনডেক্স চাপে ছিল।
EU, চীন ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে শুল্ক আরোপের সতর্কবার্তা দিতে প্রস্তুত, পাশাপাশি যেকোনো পাল্টা পদক্ষেপের জবাবে অতিরিক্ত 10% শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন—এ নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না বলেও জানিয়েছেন। ইসরায়েলের হামলা এবং OPEC+-এর আগস্টে আকস্মিকভাবে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে Crude Oil-এর দাম কমেছে, বিশেষ করে ডলার শক্তিশালী হওয়ায়। চীন প্রণোদনা ও বাণিজ্য সহায়তার ইঙ্গিত দিলেও, একই কারণে Gold-এর দামেও চাপ পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা, দুর্বল EU অর্থনৈতিক তথ্য এবং ECB-র সম্ভাব্য সুদহার কমানোর মধ্যে ইউরোর রিজার্ভ কারেন্সির মর্যাদা নিয়ে সন্দেহ—এসব কারণে EURUSD কমেছে। চ্যান্সেলর Reeves-কে ঘিরে যুক্তরাজ্যের রাজস্বসংক্রান্ত উদ্বেগে GBPUSD-এর পতন আরও বেড়েছে।
জাপানে মজুরি দুর্বল হওয়া এবং বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কায় USDJPY সামান্য বেড়েছে। ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা, শক্তিশালী USD এবং RBA ও RBNZ-এর বৈঠকের আগে AUDUSD ও NZDUSD কমেছে। তেলের দাম দুর্বল হওয়া এবং ডলার শক্তিশালী হওয়ায় USDCAD-এর পুনরুদ্ধার অব্যাহত রয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য নিয়ে আশাবাদ এতে প্রভাব ফেলতে পারেনি। 14 জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ “ক্রিপ্টো উইক”-এর আগে মিশ্র মনোভাবের মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর গতিও কমেছে।
মিশ্র অর্থনৈতিক তথ্যের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)-এর অর্থনৈতিক রূপান্তর নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি EU, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনাও বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। সতর্ক European Central Bank (ECB) কর্মকর্তারা—যাঁরা আরও সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না—EURUSD-এর ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। US Dollar-এর সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধারও এই কারেন্সি পেয়ারের টানা দুই সপ্তাহের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
যুক্তরাজ্যে, সরকারের সংযত ব্যয়সংকোচন নীতি এবং অর্থমন্ত্রী Rachel Reeves-কে নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয় বাজারের মনোভাবকে প্রভাবিত করায় GBPUSD-তে বিক্রির চাপ রয়েছে। এ সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাজ্যের ডেটা প্রকাশের আগে সতর্ক মনোভাব এবং Bank of England (BoE)-এর কিছুটা নেতিবাচক মন্তব্যও Cable পেয়ারে চাপ বাড়িয়েছে।
এদিকে, জাপানে প্রকৃত মজুরি দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে। এতে ব্যাংক অব জাপানের (BoJ) কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণের প্রত্যাশা দুর্বল হয়েছে এবং গত সপ্তাহের পতনের পর USDJPY-তে রিবাউন্ডে সমর্থন জুগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং জাপানি সরকারি বন্ডের (JGBs) চাহিদার ওঠানামাও ইয়েনের দুর্বলতায় ভূমিকা রাখছে, যা পেয়ারটিকে আরও ওপরে তুলছে।
G10 মুদ্রাগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলীয় ডলার (AUD) এবং নিউজিল্যান্ড ডলারের (NZD) দর সবচেয়ে বেশি কমেছে। মার্কিন ডলারের (USD) বিপরীতে AUDUSD এবং NZDUSD-তে সবচেয়ে বড় দরপতন দেখা গেছে। বাজারের ঝুঁকি এড়ানোর মনোভাব এবং এই সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ব্যাংক (RBA) ও নিউজিল্যান্ডের রিজার্ভ ব্যাংকের (RBNZ) মুদ্রানীতি বৈঠকের আগে সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন এই দরপতন। RBA সুদের হার কমাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে, RBNZ-এর বেঞ্চমার্ক রেট কমানোর জোরালো প্রত্যাশা রয়েছে, যদিও RBNZ Shadow Board এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে।
অন্যদিকে, আগের দিনের পুনরুদ্ধার অব্যাহত রেখেছে USDCAD। শক্তিশালী US Dollar এবং অপরিশোধিত তেলের দুর্বল দাম—যা কানাডার অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য—কানাডিয়ান ডলারের (CAD) ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। US-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ বাড়া এবং 2025 সালে ব্যাংক অব কানাডা (BoC) সুদের হার কমানো স্থগিত রাখতে পারে—এমন জল্পনা সত্ত্বেও এই পুনরুদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া, এই সপ্তাহের কানাডার কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত তথ্য এবং US Federal Open Market Committee (FOMC)-এর বৈঠকের কার্যবিবরণীর দিকে ট্রেডারদের নজরও CAD-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করে USDCAD-এর দরবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে।



আগস্টে উৎপাদন 548,000 ব্যারেল বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে OPEC+, যা পূর্বাভাস করা 411,000 ব্যারেলের চেয়ে বেশি। এর পর ক্রুড অয়েলের দাম কমেছে। মার্কিন ডলারের শক্তিশালী হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ বাড়াও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও—যেমন লোহিত সাগরে হুথি হামলার পর ইয়েমেনে ইসরায়েলের হামলা—এবং ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি নিয়ে আশা কমে গেলেও, তেলের দাম সমর্থন পায়নি। US-এর বাণিজ্যনীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ এই দরবৃদ্ধির পক্ষে থাকা বিষয়গুলোর প্রভাবকে ছাপিয়ে গেছে।
পরিষেবা খাত ও অভ্যন্তরীণ চাহিদায় আরও নীতিগত সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন চীনা কর্মকর্তারা। তা সত্ত্বেও সোনার দাম এক সপ্তাহের সর্বনিম্নে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে আশাবাদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদা সোনার দামকে সমর্থন করার কথা থাকলেও, শক্তিশালী মার্কিন ডলার ও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক বাজারের মনোভাবের কারণে ধাতুটির দাম বরং কমেছে।
এদিকে, আসন্ন “ক্রিপ্টো উইক”-এর আগে এবং নতুন করে তৈরি হওয়া বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ট্রেডাররা সতর্ক হয়ে পড়ায় Bitcoin (BTCUSD) ও Ethereum (ETHUSD)-এর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা এবং পুরো শিল্পজুড়ে আশাবাদ ক্রিপ্টো বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে কিছুটা সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোজোনের খুচরা বিক্রয় (মে) ও Sentix বিনিয়োগকারী আস্থা (জুলাই), পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর মাঝারি পর্যায়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের বক্তৃতা—এসবই সোমবারের অর্থনৈতিক ক্যালেন্ডারের প্রধান বিষয়। তবে শুক্রবারের Independence Day ছুটির পর US ট্রেডাররা কাজে ফেরায়, নজর সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং Donald Trump-এর নতুন করে তোলা US শুল্কের হুমকির দিকেই থাকবে।
ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দুর্বলই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ক্রুড অয়েল ও Gold-এর দামে চাপ পড়তে পারে এবং শেয়ারবাজারে নতুন করে লাভের সুযোগ সীমিত হতে পারে। তবে, সামনে থাকা ঘটনাগুলো—যেমন Federal Open Market Committee (FOMC)-এর কার্যবিবরণী, চীনের মুদ্রাস্ফীতির তথ্য, কানাডার কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এবং Reserve Bank of Australia (RBA) ও Reserve Bank of New Zealand (RBNZ)-এর সুদের হারের সিদ্ধান্ত—বাজারের মনোভাব বদলে দিতে পারে।
US Dollar (USD) কয়েক মাসের সর্বনিম্ন স্তর থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, যা কমোডিটি, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মুদ্রা এবং অন্যান্য প্রধান মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান কোনো বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাজারকে চমকে দিলে USDJPY ভিন্ন আচরণ করতে পারে। এদিকে, খুচরা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এবং আসন্ন “Crypto Week”-এর আগে ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!