
ছোটবেলায় আমরা পাইলট, মহাকাশচারী, সুপারহিরো, গায়ক কিংবা প্রত্নতত্ত্ববিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। মনে আছে, কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতাকে কল্পনা করে খেলতে আমরা কত সময় কাটাতাম? স্বপ্নের দিকে এক পা এগোতে গ্রীষ্মের পুরো ছুটি নানা কিছু করে কাটানোই ছিল স্বাভাবিক। আমরা বড়দের অবিরাম প্রশ্নে জর্জরিত করতাম, আর কম্বলের নিচে টর্চ জ্বেলে ভোর পর্যন্ত পড়তাম। আমাদের মনে ছিল বড় স্বপ্ন, আর চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে ভয় পেতাম না। সেই সব কোথায় হারিয়ে গেল?
আজ আমরা বড় হয়েছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা আর স্বপ্ন দেখি না। একটা বিষয় নিশ্চিত—ট্রেডিং করে কিছু টাকা আয় করতে পারলে এতে মজে যাওয়া স্বাভাবিক। শুধু নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে টাকা আয় করা দারুণ, তাই না?
আপনি ফরেক্সে একেবারেই নতুন হন বা না হন, সম্ভবত ফরেক্স মার্কেটে সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এই নিবন্ধে বিখ্যাত পেশাদার ট্রেডারদের সাফল্যের গল্প তুলে ধরা হয়েছে এবং কীভাবে সফল ট্রেডার হওয়া যায়, সে বিষয়ে বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইংল্যান্ডের ব্যাংককে নাড়িয়ে দেওয়া এক ব্যক্তির গল্প জানতে, ‘মুদ্রার সুলতান’ কে তা খুঁজে বের করতে এবং আরও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা পড়তে সঙ্গে থাকুন!
George Soros Stanley Druckenmiller Bill Lipschutz
মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখার সময়ও হয়তো আপনার মনে এমন কেউ ছিলেন, যিনি আপনাকে অনুপ্রাণিত করতেন। উন্নতি করার অন্যতম সেরা উপায় হলো অন্যের উদাহরণ থেকে শেখা। একদিন সবচেয়ে সফল কারেন্সি ট্রেডারদের তালিকায় জায়গা করে নিতে চাইলে, একজন আদর্শ ট্রেডারকে অনুসরণ করা অবশ্যই দরকার। বিশ্বের সেরা ফরেক্স ট্রেডার কারা, তা জানুন এবং সংক্ষেপে দেখুন তাঁরা কীভাবে সফল হয়েছেন। আশা করি, এই ট্রেডারদের সাফল্যের গল্প আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে এবং পথনির্দেশ দেবে।
প্রো ট্রেডারের মতো ট্রেড করতে চান, কিন্তু ফরেক্স ট্রেড করার সময় পান না? সারা বিশ্বের শীর্ষ ট্রেডারদের ট্রেড রিয়েল-টাইমে কপি করুন, আর তাদের আপনার হয়ে আয় করতে দিন।
একজন বা কয়েকজন ট্রেডার বেছে নিয়ে যেকোনো সময়ের জন্য তাদের ট্রেডিং সিগনালে সাবস্ক্রাইব করুন। নির্বাচিত ট্রেডারদের ট্রেড আপনার অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। চাইলে আপনি ট্রেডগুলো নিজের মতো করে সাজিয়ে ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
চলুন শুরু করি কিংবদন্তি ট্রেডার, ফরচুনের প্রিয়জনকে দিয়ে।

আপনি গুগলে “সেরা ফরেক্স ট্রেডার কে?” লিখে খুঁজলে, তালিকার শীর্ষে সরোসের নাম দেখতে পাবেন। ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিনিয়োগকারী এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে হার মানানো ট্রেডার হিসেবে পরিচিত তিনি। কথিত আছে, 1992 সালের ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে (16 সেপ্টেম্বর) শর্ট পজিশনে ট্রেড করে তিনি £1.5 বিলিয়নেরও বেশি আয় করেছিলেন। এটি কি অসাধারণ দূরদৃষ্টি ও সাহসের উদাহরণ নয়?
উল্লেখ্য, তখন গ্রেট ব্রিটেন ছিল এক্সচেঞ্জ রেট মেকানিজমের (ERM) অংশ। পাউন্ডের মান ডয়েচে মার্কের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি কমে গেলে ERM-এর অধীনে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হতো। সে সময় ইউরোপের প্রধান মুদ্রা ছিল ডয়েচে মার্ক, কারণ জার্মানির অর্থনীতি ছিল সবচেয়ে স্থিতিশীল।
আগেই বলা হয়েছে, পাউন্ডের মান ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ব্রিটেন, যদিও তখন এর মান ইতিমধ্যেই কমছিল। সরকার দুইভাবে পাউন্ডের মানকে সমর্থন করতে পারত। প্রথমত, পাউন্ড কিনতে স্বর্ণের রিজার্ভ ব্যবহার করে। অর্থাৎ, অন্যান্য দেশের মুদ্রার সঙ্গে পাউন্ডের মান সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে ব্রিটেন হস্তক্ষেপ করতে পারত। আরেকটি উপায় ছিল সুদের হার বাড়ানো। সরকার চাইলে একই সময়ে দুটিই করতে পারত। তবে এসব পদক্ষেপ অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতো। রিজার্ভ খরচ করার অর্থ ছিল করদাতাদের অর্থ অপচয় করা, আর সুদের হার বাড়ালে এমনিতেই দুর্বল বিনিয়োগ আরও নিরুৎসাহিত হতো।
জর্জ সরোসই ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের দুর্বলতার চরম মুহূর্তটি অনুমান করতে পেরেছিলেন এবং সরাসরি আঘাত হেনেছিলেন।
তিনি তা কীভাবে করেছিলেন? ব্ল্যাক ওয়েডনেসডের কয়েক মাস আগে থেকেই সরোস পাউন্ডে বড় পজিশন গড়ে তুলছিলেন, শর্ট করার উপযুক্ত সংকেতের অপেক্ষায়।
ব্ল্যাক ওয়েডনেসডের আগের দিন সরোস বুন্দেসব্যাংকের প্রেসিডেন্টের একটি বিবৃতি পেয়েছিলেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, শিগগিরই এক বা দুটি ইউরোপীয় মুদ্রার মান দমে যেতে পারে। সরোস পাউন্ডের ওপর বাজি ধরেছিলেন এবং সফল হন। হেজ ফান্ড ও অংশীদারদের সহায়তায় তিনি বিক্রি করার জন্য বিপুল পরিমাণ পাউন্ড জমা করেছিলেন। নিজের হেজ ফান্ডের পরিমাণ 15 বিলিয়ন পাউন্ডে বাড়াতে তিনি কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড ধার করার সাহসও দেখিয়েছিলেন।

1992 সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনের প্রধান সংবাদপত্রগুলোর শিরোনাম। সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জনসাধারণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এতে ফুটে উঠেছে।
আপনি হয়তো ঠিকই বলবেন, এত টাকা ধার করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সরোস ও তাঁর অংশীদারদের জন্য এটি ছিল স্প্রেড থেকে লাভ করার দারুণ সুযোগ। সর্বোচ্চ ঝুঁকি ছিল শুধু ঋণের সুদ, অথচ সম্ভাব্য মুনাফার পরিমাণ ছিল বিশাল। ভাবুন তো, আপনি একই কাজ করলে কী হতে পারত:
এবার ভাবুন, 15 বিলিয়ন পাউন্ড শর্ট করার ক্ষেত্রে এই কৌশলের প্রভাব কী হতে পারে। ব্ল্যাক ওয়েডনেসডের সকাল 9টার মধ্যে ব্রিটিশ সরকার মুদ্রার দামের তীব্র পতন ঠেকাতে কিছুই করতে পারেনি। সুদের হার 10% থেকে বাড়িয়ে 12% করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী যত পাউন্ড সম্ভব কেনা—কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। পরদিন ডয়েচে মার্কের তুলনায় পাউন্ডের দাম 15% এবং মার্কিন ডলারের তুলনায় 25% কমে গিয়েছিল।
পাউন্ডের অবমূল্যায়নের পর সরোসের হেজ ফান্ডের মূল্য বেড়ে 22 বিলিয়ন পাউন্ডে দাঁড়ায়। হেজ ফান্ডের ব্যবস্থাপকেরা সাধারণত মুনাফার 20% পান। এই চুক্তি থেকে সরোস ও তাঁর অংশীদাররা প্রত্যেকে প্রায় 1.5 বিলিয়ন পাউন্ড পেয়েছিলেন।




বিশ্বের সেরা ফরেক্স ট্রেডারদের তালিকায় কারা আছেন জানতে চাইলে, সেখানে ড্রুকেনমিলারের নাম দেখতে পাবেন। তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী, যিনি জর্জ সরোসের মতোই ট্রেডিং কৌশল অনুসরণ করতেন: একদল শেয়ারে লং পজিশন, আরেকদল শেয়ারে শর্ট পজিশন নিতেন এবং ফিউচার ও মুদ্রায় ট্রেড করতে লিভারেজ ব্যবহার করতেন।
উল্লেখ্য, তিনি 2000 সাল পর্যন্ত জর্জ সরোসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং 1992 সালে ব্রিটিশ পাউন্ডের অবমূল্যায়নের সময় সরোসকে সহায়তাকারী অংশীদারদের একজন ছিলেন।
তিনি Duquesne Capital-এর সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট। 1981 সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। 2010 সালে ফান্ডটি বন্ধ করে দেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, ক্লায়েন্টদের উচ্চ রিটার্ন দিতে তিনি পারছেন না। Wall Street Journal-এ প্রকাশিত সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, Druckenmiller “ক্লায়েন্টদের জানিয়েছিলেন যে তিনি তাঁদের অর্থ ফেরত দিচ্ছেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানের 30 বছরের কার্যক্রম শেষ করছেন। নিজের প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারার ‘তীব্র মানসিক চাপের’ কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।” তিনি স্বীকার করেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিচালনা ও তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বড় মুনাফা করা কঠিন।
2009 সালে তাঁকে আমেরিকার সবচেয়ে দানশীল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর ফান্ডগুলো চিকিৎসা গবেষণা, শিক্ষা, দারিদ্র্যবিরোধী কর্মসূচি এবং বিভিন্ন অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সহায়তা করছে।

Bill Lipschutz জীবন্ত প্রমাণ যে, কখনও কখনও পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী হওয়াই একদিন Forex-এ বিপুল মুনাফা করার জন্য যথেষ্ট।
তরুণ বয়সে দাদির মৃত্যুর পর Lipschutz 12,000 ডলারের শেয়ার উত্তরাধিকারসূত্রে পান। পড়াশোনার সময় অবসর সময়ে তিনি বিনিয়োগ শুরু করেন। বাজার সম্পর্কে গবেষণা করতে এবং পাওয়া যায় এমন সব তথ্য পড়তে তিনি লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতেন।
তিনি Salomon Brothers-এর নতুন গঠিত Forex Trading Department-এ কাজ শুরু করেন। Salomon Brothers ট্রেডারদের একটি দল গড়ে তোলে এবং কারেন্সি ট্রেডিং শেখার একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের বিকাশ শুরু হওয়ার প্রায় একই সময়ে Salomon Brothers কারেন্সি ট্রেডিং নিয়ে কাজ শুরু করে। 1985 সাল নাগাদ Lipschutz Salomon Brothers-এর জন্য বছরে 300 মিলিয়ন ডলার আয় করছিলেন।
1995 সালে Bill Lipschutz G10 কারেন্সিতে বিশেষায়িত গ্লোবাল ম্যাক্রো ম্যানেজার Hathersage Capital Management প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই Lipschutz সেখানে প্রিন্সিপাল এবং পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সফল ক্যারিয়ার তাঁকে 200 মিলিয়ন ডলারের Forex ট্রেডিং কোম্পানি গড়তে অনুপ্রাণিত করে।
তাঁর আরেক নাম ‘মুদ্রার সুলতান’। তিনি FX-কে অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক বাজার হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ট্রেডিং পদ্ধতি অনুযায়ী, ট্রেডিংয়ে মাত্র 20-30% সময় সঠিক হলেও সবচেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করা সম্ভব।
সঙ্গে থাকুন! আমাদের শিক্ষা বিভাগে আপডেট দেখুন।
এই উপকরণে বিনিয়োগসংক্রান্ত পরামর্শ, বিনিয়োগের সুপারিশ, আর্থিক উপকরণে কোনো লেনদেনের প্রস্তাব বা আহ্বান নেই এবং এটিকে এমন কিছু আছে বলে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। কোনো বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, ঝুঁকিগুলো বুঝতে পারছেন কি না তা নিশ্চিত করতে স্বাধীন আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নিন।